ব্যাংকের টাকা গেল কোথায়

বিডিকষ্ট ডেস্ক

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাক হওয়া প্রায় ৮০০ কোটি টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে তা নিশ্চিত করতে পারছে না কেউ। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বিভিন্ন দেশের যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে তারাও পুরোপুরি নিশ্চিত নন হ্যাক হওয়া অর্থ যাদের অ্যাকাউন্টে গেছে তারা আসলে কারা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে হ্যাক হওয়া অর্থ ফেরত পেতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। আবার ফেডারেল রিজার্ভ বলছে তাদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূত কোনো টাকা স্থানান্তর হয়নি। অন্যদিকে পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সেই তদন্তের অগ্রগতি কী, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছুই জানা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেডারেল রিজার্ভ) থেকে জমা রাখা প্রায় ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ হ্যাক হওয়ার ঘটনাটি গত সোমবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর যা বলা হচ্ছে তা হলো, তদন্তের স্বার্থে আপাতত কিছু বলা যাবে না। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জালিয়াতি হওয়া পুরো টাকাই উদ্ধার করা সম্ভব। সময়সাপেক্ষ হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের টাকা উদ্ধার হবে। জালিয়াতি হওয়া টাকা কোথায় আছে বা যারা জড়িত তাদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি ফিলিপাইনে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ দেখছে। তারা আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা করছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ ফিলিপাইনের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে হ্যাক হওয়া অর্থ দেশটির স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে ৩৭০ কোটি ফিলিপাইনি মুদ্রা সমমানের অর্থ তুলে নেয় হ্যাকাররা। এরপর একটি ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারের কাছে পাঠানো হয়েছিল ওই অর্থ এবং পরে তা সিটি অব ড্রিমস ও মিদাসের সোলেয়ার রিসোর্ট ও ক্যাসিনোতে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সে অর্থগুলোকে জুয়ার চিপস (বাজির কয়েন) হিসেবে রূপান্তরিত করে বাজি ধরার উপযোগী করা হয়। আর শেষ পর্যন্ত আবার সেগুলোকে নগদ অর্থে রূপান্তরিত করে হংকংয়ের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, বিভিন্ন দেশ ঘুরে এ অর্থ এখন কোথায় আছে, কার কাছে আছে? অনেকের প্রশ্ন, এ অর্থ কি উদ্ধার করা সম্ভব? বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, পুরো বিষয়টি নিয়ে আমরা বিভিন্নভাবে তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছি। বিশ্বব্যাংকের একজন সাইবার বিশেষজ্ঞ যিনি আমাদের একটি প্রকল্পে কাজ করছেন, তার মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে তার মাধ্যমে হ্যাক হওয়া অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন সংস্থাটির ডেপুটি গভর্নর। বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হ্যাক হওয়া অর্থ কোথায় আছে তা চিহ্নিত করতে পারলে আমরা মনে করি অর্থ উদ্ধার সম্ভব। টাকা উদ্ধারের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংককে সহায়তা করতে পারে।

 

01

বিশ্বব্যাংক কীভাবে সেই সহায়তা করতে পারে— এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. জাহিদ বলেন, প্রতারণা বা জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বা সম্পদ আত্মসাৎ বা চুরি বা এ ধরনের যে কোনো ঘটনার পর ওই সম্পদ বা অর্থ উদ্ধারে জাতিসংঘের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের একটি যৌথ প্রক্রিয়া রয়েছে। এ প্রক্রিয়াটিকে স্টোলেন এসেট রিকভারি (স্টার) ইনিশিয়েটিভ বলে অভিহিত করা যায়। ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম এবং বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে এ সম্পদ উদ্ধারে ভুক্তভোগী রাষ্ট্র বা সংস্থাকে সহায়তা করে। বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের হ্যাক হওয়া অর্থ যেহেতু ফিলিপাইনের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানান্তর হয়েছে, তাই অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশকে ফিলিপাইনের আইন অনুযায়ী তদন্ত বা এ-সংক্রান্ত আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেহেতু জাতিসংঘের সদস্য তাই এসব ব্যাপারে সহায়তা করবে ‘স্টার’।

এ ছাড়া এর আগে হ্যাক হওয়া অর্থ শ্রীলঙ্কা থেকে যেভাবে উদ্ধারের প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে সে ধরনের প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা।

অর্থ উদ্ধারে সব ধরনের বিকল্প ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এমনকি এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছেন কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে সুইফট কোড (গোপন সংকেত) ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভের অর্থ লেনদেন করত সেই কোড কীভাবে হ্যাকারদের কাছে গেল সে বিষয়টিকে তদন্ত কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা রাজি হাসান জানান, আমরা দেশের ভিতরে এবং বাইরে যেসব পক্ষ এই হ্যাক হওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে তাদের বিষয় খতিয়ে দেখছি। তদন্তের মাধ্যমে এসব তথ্য বের করতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান। জানা গেছে, ফিলিপাইনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থ স্থানান্তর ও মানি লন্ডারিং বিষয়ে চুক্তি হয় ২০১৩ সালে। ওই চুক্তি অনুযায়ী যে কোনো ধরনের মানি লন্ডারিং বিষয়ে দেশটি বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে রাজি। এগমন্ড গ্রুপের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা করার কথা। তদন্তের বিষয়টি শুধু ফিলিপাইনের সঙ্গে যৌথভাবে হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী হ্যাকিংয়ের একাধিক গ্রুপ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগকৃত সাইবার বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্তানা। বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তার ধারণা, এর সঙ্গে আন্তরাষ্ট্রীয় একাধিক হ্যাকার জড়িত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে টাকাগুলো হ্যাক হওয়ার পর তা কোথাও স্থির থাকেনি। বিভিন্নভাবে এখনো চলমান রয়েছে। সর্বশেষ ফিলিপাইন থেকে ওই অর্থ হংকংয়ে গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতে পেরেছে। তবে তারপর কোথায় কী অবস্থায় আছে, সে তথ্য সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকসূত্রে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওই ব্যাংকে বাংলাদেশের প্রায় চার বিলিয়ন ডলার জমা আছে। এ অর্থের বিপুল অংশ হ্যাকাররা কোড হ্যাক করে জালিয়াতির চেষ্টা করে। প্রথমে ৫ অর্ডারের মাধ্যমে ১০ কোটি ডলার নিয়ে যায়। যার একটি অংশ শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে জমা হয়। বাংলাদেশ আপত্তি দেওয়ার পর যা সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কা আটকে দেয়। বিষয়টি বর্তমানে শ্রীলঙ্কাও তদন্ত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, শ্রীলঙ্কায় আসা ২০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই রিজার্ভের সুইফট কোড নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সুইডেনভিত্তিক কোম্পানি সিএমএ স্মল সিস্টেম। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনকারী সুইফটের সঙ্গে যুক্ত স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেড, যারা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক লেনদেন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। এদের মাধ্যমে সুইফট কোড পাচার হয়েছে কিনা, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-এর বৈঠক : ব্যাংক মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-এর নেতারা গতকাল বিকালে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে জালিয়াতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেন অর্থমন্ত্রী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: