663f4b535651e4f28b09033ff44a035e-bbank

নতুন গভর্নর ও স্বায়ত্তশাসন

বিডিকষ্ট ডেস্ক

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনায় কেবল ৮০০ কোটি টাকাই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে দীর্ঘ মেয়াদে আরও বেশি ক্ষতির দিকে ঠেলে দেবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। যদিও যে অঘটন ঘটে গেছে, তার সঙ্গে স্বায়ত্তশাসনের সরাসরি সম্পর্ক আলগা, কিন্তু সে অঘটনের পরে যা ঘটছে, তাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, যিনি অর্ধডজন গভর্নরের মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন, তিনি ১৭ মার্চ আমাকে বলেন, ‘কোনো অজুহাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন করা ঠিক হবে না। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবদিহি, দক্ষতা ও নজরদারি কী করে আরও শক্তিশালী করা যায়, সেটাই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।’ নবনিযুক্ত গভর্নরকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু তাঁর কার্যপরিধি ও তাঁর উত্তরসূরি নিয়োগের প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন খুবই জরুরি।

 

একজন নতুন গভর্নরকে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হলো, তা স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে দুর্বল করেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সম্পর্কে আমাদের ধারণা এখনো বেশ অপরিপক্ব। একই ঘটনার দুটি দৃশ্য—ফিলিপাইনে লাইভ শুনানি চলছে, তার বিবরণ আমরা ছাপছি। সেখানে অভিযুক্তরা স্বপদে থেকেই সিনেটের ব্লু রিবন কমিটিতে কৈফিয়ত দিচ্ছেন।  আর এখানে আমরা পদত্যাগ আর অপসারণে বুঁদ আছি। এ সবই যেন বিরাট কৃতিত্ব। এখনকার ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের কেন দ্রুত পর্দার আড়ালে নিতেই আমরা এতটা উতলা হলাম? এরপরও আমরা বলি না, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন এতে থাকল না কাটা পড়ল?

কেন এখনো একটা কাদা-ছোড়াছুড়িমুক্ত পরিবেশে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্মানজনক গণশুনানির মুখোমুখি করা হবে না? ফিলিপিনোরা কেন দ্রুততার সঙ্গে পুরো বিষয়টিকে থানা-পুলিশের কাছে ইজারা দেয়নি? অন্যতম মুখ্য সন্দেহভাজন মায়া সন্তোস-দেগুইতো, যাকে গাড়িতে করে টাকা নিতে দেখার প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে, সেই নারী ব্যাংকারকে সৌজন্য বজায় রেখে একটি নিরুত্তাপ পরিবেশে ১৫ মার্চ শুনানিতে অংশ নিতে দেখা গেল। আরসিবিসি ম্যানেজার মায়া ও আরেক ডেপুটিকে অপসারণ করেছে আরও সাত দিন পরে ২২ মার্চ। আর আমরা বিষয়টিকে কেবলই প্রচলিত কম বিশ্বস্ত গোয়েন্দা ও পুলিশি ব্যবস্থার কাছে ঠেলে দেওয়াকেই একমাত্র বিকল্প মনে করলাম।

অবাক ব্যাপার হলো, নতুন গভর্নরকে যে নাটকীয়তায় নিয়োগ দেওয়া হলো, তদুপরি তা নিয়ে নাগরিক সমাজে বা মিডিয়ায় কোনো প্রশ্ন তোলা হলো না। রাজনৈতিক বিবেচনায় গভর্নর নিয়োগের ইতিহাস আমাদের একেবারে নতুন নয়। ড. আতিউর মেধাবী হলেও সেই বিবেচনাটাই ছিল তীব্র। এবার আমরা একজন নতুন গভর্নর পেলাম, যাঁর বিষয়ে আমরা খুব বেশি কিছু জানি না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে তিনি রেলওয়েতে সহকারী ট্রাফিক সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে কর্মজীবনের সূচনা করেছিলেন। আমরা আর্থিক নীতি–বিষয়ক তাঁর ভিশন শুনতে চাই। তিনি ডিসি হয়েছেন, সচিব হয়েছেন, সরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছেন। সবটাই খাস সরকারি চাকরি।  আমরা জানতে চাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে তিনি কীভাবে দেখেন?

চুরির টাকা ফিরিয়ে আনা তাঁর রুটিন কাজ। অপসারিত গভর্নরের অনুযোগ ছিল তাঁর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ঘটত, সেসব আমরা জানতে চাই। রিজার্ভ বাড়ানো নয়, গভর্নরের কাজ রিজার্ভ ‘ব্যবস্থাপনা’ (হোল্ড অ্যান্ড ম্যানেজ) করা। এমআইটির পিএইচডি ডিগ্রিধারী ভারতীয় গভর্নর রঘুরাম রাজন নিয়োগ পেয়েই তিনি তাঁর তিন বছর মেয়াদের রূপকল্প দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মুদ্রাস্ফীতির টুঁটি চেপে ধরাই তাঁর প্রাথমিক কাজ। সেখানে তাঁর কৃতিত্ব বিষয়ে তর্ক নেই। ভারতীয় সাবেক গভর্নর সি. রঙ্গরাজান গত ফেব্রুয়ারিতে দ্য হিন্দুতে লিখেছেন, ‘মুদ্রাস্ফীতির টার্গেট যদি লঙ্ঘিত হয়, তাহলে দুনিয়াজুড়ে গভর্নরদের যোগ্যতার প্রশ্নটি সামনে আসে।’ আমরা জানতে চাই, নবনিযুক্ত গভর্নর ফজলে কবিরের কোন বিষয়ে টার্গেট কী?

আমাদের কেমন গভর্নর চাই? এই প্রশ্নে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সর্বজনীন উত্তর: ‘আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক যোগ্যতার সঙ্গে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান থাকতে হবে। সর্বোপরি তাঁকে বড় মাপের ব্যক্তিত্ব হতে হবে।’ বড় মাপের ব্যক্তিত্ববান না হলে নির্বাচন কমিশনের মতো সংস্থাগুলোর কী দশা হয়, সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। মনমোহন সিং গভর্নর থেকে দলবাজি না করেও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বড় মাপের সঙ্গে দলের মাপের বিরোধ বাধবেই। আমরা নবনিযুক্ত গভর্নরের কাছে বড় মাপটাই আশা করব। সরকারের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতে তাঁকে স্বায়ত্তশাসনকেই সমর্থন ও তার নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। নতুন দুই ডেপুটি গভর্নরকে কেমন করে বাছাই করা হচ্ছে, তা কি আমরা চূড়ান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির আগে জানতে পারব? ব্যাংকটির ভেতরের প্রশাসনের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়টিও যাচাইয়ের দাবি রাখে। যোগ্য ও সৎ জনবল আসল নিয়ামক শক্তি।

কাউকে চুক্তিভিত্তিক বা তদবিরে নিয়োগ দিলাম, আবার ‘যথা প্রক্রিয়া’ অনুসরণ না করে তা বাতিল করলাম, কোনো স্বচ্ছ-প্রক্রিয়া অনুসরণের ধার ধারলাম না, এটা তো হতে পারে না। আইএমএফের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ টনি লিবেক তাঁর ২০০৪ সালের এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছিলেন যে ‘গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের মনোনয়ন ও নিয়োগ অবশ্যই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পৃথক সংস্থার অধীনে হতে হবে। সেখানে একটি ইনস্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক থাকতে হবে।’ আমরা এত বড় একটি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়লাম, তদুপরি যেন কোনো শিক্ষা নিলাম না। ধরেই নিলাম একজন যোগ্য গভর্নর পেয়েছি, সামনে যোগ্যতর ডেপুটি গভর্নর পাব। কিন্তু তাঁদের নিয়োগের বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো কথা বলব না? চেক প্রজাতন্ত্র ও পোল্যান্ডে গভর্নর সরকার দ্বারাই নিযুক্ত হন না। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের নিয়োগ ‘মন্ত্রিসভার’ (প্রধানমন্ত্রীর নয়) পরামর্শে রানি দিয়ে থাকেন। আমরা নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে কোনো আলোচনার কথাই শুনলাম না।

অর্থমন্ত্রী বলছেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাস্থ্যসম্মত অবস্থায় নেই, এর বিরাট সংস্কার দরকার।’ কিন্তু এই রুগ্‌ণ অবস্থা এক দিনে হয়নি। ২০০৩ সালে একটি সংশোধনী এনে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে চার পরিচালক পদে যাতে সরকারি কর্মকর্তা ঢুকতে না পারেন, তার বিধান করা হয়। কিন্তু এই চার বেসরকারি পরিচালকের কণ্ঠ আমরা কি শুনতে পাই? আমরা কেউ কি শুনতে চাই? দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, পেরু ও তিউনিসিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে সরকারি প্রতিনিধি রাখা বাধ্যতামূলক নয়।

অন্তত ছয়টি বিষয়কে স্বায়ত্তশাসনের মাপকাঠি ধরা হয়। সরকার ঋণ চাইলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাকে না বলার হিম্মত রাখবে, যা এ দেশে কেউ কখনো করতে পারে না। সরকারের ওপর নির্ভরশীল না থেকেই ব্যাংক পরিচালনার খরচ মেটানো যাবে। ব্যাংক পরিচালনা পরিষদ ও গভর্নর দায়িত্ব পালনে স্বাধীন থাকবেন। আর্থিক নীতি অনুসরণে গভর্নর স্বাধীন থাকবেন। ব্যাংক তার আর্থিক হাতিয়ার বাছাইয়ে মুক্ত থাকবে এবং সর্বোপরি ব্যাংকিং নীতি নিয়ন্ত্রণেও তারা সরকারের মুখাপেক্ষী হবে না। অর্থ মন্ত্রণালয় দাবি করছে, আতিউরের মেয়াদে তারা মাত্র তিন-চারটা ‘নির্দেশনা’ দিয়েছিল। সেই হস্তক্ষেপগুলো কী ছিল?

দুটি বিষয়কে আমরা আলাদাভাবে বুঝতে চাই। একদিকে চুরির ঘটনার দ্রুত তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং গভর্নর, ডেপুটি গর্ভনরসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহি ও টাকা ফিরিয়ে আনা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন। নতুন গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, ‘টাকা চুরির ঘটনায় কর্মকর্তাদের নৈতিক মনোবল ভেঙে পড়তে পারে।’ কিন্তু অনেক আগেই তো হল-মার্ক ও বেসিকের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান বিশ্বে নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও তার জবাবদিহি ব্যবস্থাকে আদর্শ মনে করা হয়। আর তার আইন বলছে, ‘কোনো গভর্নর নিয়োগের আগেই তাঁর মেয়াদে ব্যাংকের প্রাথমিক কার্যক্রম চালানোর “পলিসি টার্গেট” কী কী হবে, সে বিষয়ে তিনি সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করে নেবেন।’ সেই সংস্কৃতি আমরা গড়িনি, এমন চুক্তি করতে গভর্নরকে সাহস জোগাতে হবে। সরকারের সঙ্গে সংঘাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি সুরক্ষা থাকা দেশগুলোর মধ্যে আর্মেনিয়া, গুয়াতেমালা, উগান্ডা ও জাম্বিয়ার মতো উন্নয়নশীলরা আছে। আর্থিক নীতি প্রণয়নে ফিলিপাইন, রাশিয়া ও ‘জেসমিন বিপ্লবের’ দেশ তিউনিসিয়ার মতো দেশে সরকারের কোনো অনুমোদন লাগে না। ভারতের গভর্নর সরকারি মতের বিরুদ্ধে ‘ভেটো’(মানি না) প্রয়োগ করতে পারেন, যদিও বিজেপি এখন তার রাশ টানতে চাইছে।

 ‘হ্যাকড’ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, তাই এর খণ্ডিত মূল্যায়ন সমীচীন নয়। এর সঙ্গে সোনালী বা বেসিক ব্যাংক ‘ডাকাতি’র তুলনা চলে না, কিন্তু সবটাই জনগণের পবিত্র আমানত, যার নিরাপত্তা রাষ্ট্র দিতে পারেনি। এবং পৃথিবীতে এত বড় মাপের কীর্তি এটাই নাকি প্রথম। এখন একই সংবেদনশীলতায় সোনালী ও বেসিকে ডাকাতির সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে কি আমরা কোনো পরিবর্তন দেখব? কারণ ‘ডাকাত’ কি ‘চোরকে’ পথ চেনায়নি? সামগ্রিকভাবে পুরো ব্যাংক বা আর্থিক খাতে ব্যবস্থাপনাগত একটা বিরাট সংস্কার দরকার।

২০০২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ‘যেসব দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য জোরালো, সেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে।’ তার অর্থ দাঁড়ায়, আইনের শাসন ও সুশাসন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ১০৩টি দেশের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষা দেখাচ্ছে যে রাজনীতিকেরা তাঁদের সুবিধা বা অসুবিধা হ্রাস-বৃদ্ধির নিরিখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড়কর্তাদের নিয়োগ ও অপসারণ করার প্রবণতা দেখিয়ে থাকেন।

শেষ করব ব্লুমবার্গ ডটকমে প্রকাশিত বাংলাদেশে সাইবার হামলার বিষয়ে ‘সাইবার আর্কের’ মি. ডালকিনের একটি মন্তব্য দিয়ে। বিশ্বে ১০০ কোটি ডলার ‘হ্যাকড’ হয়েছে গত বছর। ডালকিনের কথায়, ‘অ্যাটাকার্স লুক ফর দ্য ক্রেডেনশিয়ালস দ্যাট উড অ্যানাবেল দেম টু রিচ দেয়ার গোলস।’ এর অর্থ হলো, আক্রমণকারীরা গ্রহণযোগ্যতার দিকে নজর দেয়, আর সেটাই তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়ে থাকে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার একটা গ্রহণকাল চলছে, আর সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও একটা কালো ছায়া পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: