3

সেন্ট মার্টিনের ৬৭% প্রবালই মরে গেছে!

বিডিকষ্ট ডেস্ক

 

কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রবাল রক্ষা করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই দ্বীপের তিন দিকে বিস্তৃত প্রবালের প্রায় ৬৭ শতাংশ মরে গেছে। সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে অবশিষ্ট প্রবালও শেষ হয়ে যেতে পারে—এমনটা আশঙ্কা পরিবেশবিদদের।
সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেভ আওয়ার সি (এসওএস) এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তিন বছর ধরে সেন্ট মার্টিনের প্রবাল নিয়ে গবেষণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
গবেষণা প্রতিবেদনে প্রবাল মরে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, জীবিকার জন্য মানুষের অবাধে প্রবাল আহরণ, পর্যটকবাহী অতিরিক্ত জাহাজের চলাচল, হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্যসহ সাগরে চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, ক্যান ও সিগারেট নিক্ষেপ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজের অধ্যাপক হোসেন জামাল প্রথম আলোকে বলেন, নানা কারণে সেন্ট মার্টিনের প্রবাল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম পর্যটন ব্যবসা। এ ছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের কারণেও প্রবাল নষ্ট হচ্ছে। প্রবাল রক্ষায় সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় অবশিষ্ট প্রবালও ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

11ef153866e92415d51ab5ee41f28338-Cox-Probal-2--29-03-16
সেভ আওয়ার সি সূত্র জানায়, গবেষণায় অর্থসহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। গত ২ ফেব্রুয়ারি এফএওর কাছে পাঠানো হয় সমুদ্রতলের প্রবাল সুরক্ষাবিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিবেদন। এতে প্রবালের বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়। এর সত্যতা নিশ্চিত করে সেভ আওয়ার সির প্রধান নির্বাহী ও সমুদ্রতলের অালোকচিত্রী মোহাম্মদ আরজু প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের ২৮ থেকে ৩০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে প্রবাল। গত তিন বছর আমরা সমুদ্রতলে অনুসন্ধান চালিয়ে ৬৮ প্রজাতির প্রবাল আবিষ্কার করেছি। এর মধ্যে ব্রেন কোরাল (মগজের মতো), ট্রি কোরাল, হানিকম কোরাল (মৌমাছির বাসার মতো) ও সি-ফ্যান কোরাল (গাছের ডালের মতো) প্রজাতি বেশি পাওয়া গেছে। কিন্তু প্লাস্টিক বোতল, ক্যান, বর্জ্যসহ ময়লা–আবর্জনার কারণে ইতিমধ্যে প্রবালের ৬৭ শতাংশ মরে গেছে। অবশিষ্ট প্রবাল রক্ষার উপায় হিসেবে কিছু সুপারিশনামা আমরা গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি। এসবের বাস্তবায়ন না হলে সেন্ট মার্টিন প্রবালশূন্য হয়ে পড়বে।’
পলি জমে মরে যাচ্ছে প্রবাল l ছবি: সংগৃহীত

মোহাম্মদ আরজু জানান, প্রবাল মরে যাচ্ছে মূলত পর্যটকবাহী একাধিক জাহাজ চলাচলের কারণে। জাহাজের পাখা (প্রফেলার) ঘুরলে পলি পানির সঙ্গে মিশে ওপরে ওঠে। এরপর ওই পলিতে ঢাকা পড়ে প্রবালের ওপর জড়িয়ে থাকা শৈবাল। স্বচ্ছ জলের নিচে থাকা প্রবাল সূর্যের আলো থেকে খাবার সংগ্রহ করে। কিন্তু পলি বা ময়লা–আবর্জনা জমে থাকলে তা সম্ভব হয় না। ফলে মরে যায় প্রবাল-শৈবাল। তা ছাড়া সেন্ট মার্টিনের শতাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য নিক্ষেপ করা হচ্ছে সাগরে। প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন সেন্ট মার্টিন। তাঁরা বিপুলসংখ্যক চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল, কোমল পানীয়ের ক্যান, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ সাগরে ফেলছেন। জোয়ার–ভাটার সময় এসব ময়লা-আবর্জনা সমুদ্রের তলদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব অপসারণের কেউ নেই।

 
গবেষণা প্রতিবেদনে এই দ্বীপে ৬৩ প্রজাতির প্রবাল, ৪৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল ও ৫৫ প্রজাতির মাছের সচিত্র বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া গত বছর ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইসিউএন) বাংলাদেশ ও সেভ আওয়ার সি যৌথভাবে সেন্ট মার্টিনের সামুদ্রিক এলাকার সীমানা নির্ধারণ করে। এই সীমানার ভিত্তিতে এখানে মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া (এমপিএ) বা সুরক্ষিত সামুদ্রিক জলাঞ্চল কার্যকর করা গেলে বিরল প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষার পাশাপাশি পর্যটন ও মৎস্যসম্পদের টেকসই সমৃদ্ধি হতে পারে বলে মত দেন গবেষণা কর্মকর্তারা।
সেভ আওয়ার সি ও সেন্ট মার্টিনের প্রতিবেশগত সীমানা নির্ধারণী গবেষণা দলের প্রধান গবেষক আলিফা বিনতে হক জানান, এই দ্বীপের সুরক্ষার পথে প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রতিবেশগত সীমানার অন্তর্ভুক্ত এলাকাটি সুরক্ষিত করা। তারপর বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে পর্যটন এলাকা, জাহাজ চলাচলের সীমানা, স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যবহার ও মাছ ধরার অঞ্চলগুলো সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া। এ ছাড়া দ্বীপটি দৈনিক বা বার্ষিক কী পরিমাণ মানুষ থাকতে পারবে, দ্বীপে মানুষ ধারণক্ষমতার গবেষণা সম্পন্ন করা ও সেই আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া। সেই সঙ্গে জরুরি দ্বীপের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা। বিশেষত প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার ব্যবস্থা চালু করা দরকার। দ্বীপে প্লাস্টিকজাতীয় বস্তু আনা নিয়ন্ত্রণ করা ও প্রতিদিনের বর্জ্য প্রতিদিন সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ওয়ানটাইম ব্যবহারের প্লাস্টিক জিনিসপত্র দ্বীপে আনা নিষিদ্ধ করা জরুরি।

 

Saint-Martin-Chera-Deep-0220151220175523
গবেষকেরা বলেন, দেড় দশক আগে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া) বলে সরকার স্বীকার করে নিলেও সংকট কাটাতে কোনো সুরক্ষামূলক উদ্যোগ আজ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি সেন্ট মার্টিন গিয়ে দেখা গেছে, পাথরের স্তূপ থেকে লোকজন প্রবাল আহরণ করে দোকান ও ঘরবাড়িতে মজুত করছেন। তারপর শিশু-কিশোরদের দিয়ে ওই প্রবাল পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এই সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রবাল–শৈবাল, শামুক-ঝিনুক আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরুল আমিন জানান, দ্বীপের প্রবাল-শৈবাল প্রায় শেষ। এখন অবশিষ্ট প্রবাল রক্ষা করতে হলে কিছুসংখ্যক মানুষকে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম জানান, মাত্র দুজন পরিবেশকর্মী দিয়ে প্রায় আট বর্গকিলোমিটারের সেন্ট মার্টিনের প্রবালসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যাচ্ছে না। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ বিষিয়ে তুলছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: