19f08e3e0e82bb3580390b7c0e5ffdf8-9

বার্লিনে বাংলাদেশ আর বাঙালি সংস্কৃতির মহামিছিল

বিডিকষ্ট ডেস্ক

আকাশে মেঘের ঘনঘটা, মাঝেমধ্যে ঠান্ডা হিমেল বাতাস, আর তা উপেক্ষা করে বার্লিনের রাস্তা জুড়ে এগিয়ে যাচ্ছে নানা ধর্ম বর্ণ আর জাতপাতের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মহা মিছিল। গত রোববার (১৫ মে) বার্লিনের আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা, মাঝে মাঝে এক চকিতে রোদ্র কখনো হালকা বৃষ্টি। এই প্রতিকূল আবহাওয়া অবশেষে হার মানে জার্মানিতে বসবাসকারী নানান দেশের সংস্কৃতি ও তাদের ধারকদের কাছে। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বর্ণাঢ্য জমকালো পোশাক আর গান বাজনার তালে বার্লিন হয়ে উঠেছিল ছন্দময় আর বর্ণিল। পাঁচ কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে তাই নেমেছিল প্রায় ছয় লাখ মানুষের ঢল, যারা উপভোগ করেছেন পৃথিবীর নানা জাতির সংস্কৃতিকে।

নানা সংস্কৃতির ৭০টি দলের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার অংশগ্রহণকারী তাদের স্ব স্ব সংস্কৃতি স্বকীয়তা নিয়ে আবার জয় করল বার্লিনের রাজপথ। এই রাজপথে ছিল বাংলাদেশ আর বাঙালি সংস্কৃতি। প্রতি বছরের মতো এবারও বার্লিন শহরের প্রাণকেন্দ্র ক্রয়েজবার্গের হারমান স্কয়ার থেকে ৬ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে যেন বিশ্ব সংস্কৃতির মেলা বসেছিল। বার্লিনের এই আন্ত-সংস্কৃতি কার্নিভ্যালের পোশাকি নাম ‘কার্নিভ্যাল ডের কল টুর’। ১৯৯৫ সাল থেকেই এই মিছিলের অংশগ্রহণ করে আসছে জার্মানিতে বসবাসরত অভিবাসী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। এই উৎসব শুরু হয়েছিল ২১ বছর আগে, তারপর থেকে প্রতিবছরই এর পরিধি আর জৌলুস ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। এই উৎসবের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জার্মানিতে যে পাঁচ লাখ অভিবাসী চড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর জার্মানিতে আন্ত-সাংস্কৃতিক সমাজ বিনির্মাণের প্রয়াসেই এই আয়োজন।

বিশ্বসংস্কৃতির এই মহা মিছিলে নেমে এসেছিল যেন সারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে চড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা জাতির ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি। কি ছিল না এই মহা মিছিলে! যেমন আছে দক্ষিণ ইউরোপের ব্রাজিল, পেরু, বলিভিয়ার অংশগ্রহণকারীরা, আছে আফ্রিকার নানা দেশ, আছে ক্যারিবিয়ান দেশসমূহের প্রতিনিধিরা, আছে এশিয়ার নানা দেশের সাংস্কৃতিক দলসমূহ। সব থেকে বড় কথা এই বিশ্ব মহা মিছিলে ছিল বাংলাদেশ আর বাঙালিরা, সঙ্গে ছিল বাঙালিদের শুভানুধ্যায়ী জার্মানরা।

প্রতিবছরের মতো এবারও বার্লিন এবং জার্মানির অন্য শহরগুলি থেকে আসা বাঙালিরা বার্লিনের রাস্তা কাঁপালেন। নারীরা বাঙালিয়ানা শাড়ি পরে, কপালে টিপ, খোঁপায় নানা রঙের ফুল, দেশীয় অলংকার পরে আর ছেলেরা লুঙ্গি-ফতুয়া ও মাথায় গামছা বেঁধে যখন কার্নিভ্যালের সঙ্গে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক, আধুনিক, লোকগীতির সঙ্গে নেচে গেয়ে দীপ্ত পদভরে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন রাস্তার দুই পার্শ্বের হাজারো মানুষ করতালি দিয়ে আর চিৎকার করে সমস্বরে তাদের অভিনন্দন জানিয়েছে।

একটি পর্যায়ে ট্রাকের দুই পাশে বিশাল ক্যানভাসে আঁকা একতারা হাতে নৃত্যরত বাউল আর ট্রাক থেকে বাজানো উচ্চ স্বরে বাংলা গানের পেছনে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধানকারী অংশগ্রহণকারী গোটা পঞ্চাশেক দলের নৃত্যরত মিছিলের ভেতর ঢুকে রাস্তার দুই পাশ থেকে কয়েক শ যুবক যুবতী বাঙালিদের দলটির সঙ্গে নাচতে থাকেন। উদ্যোক্তারা একটু দ্বিধাই পড়ে যান, কিন্তু বাংলা গানের সঙ্গে আনন্দে উচ্ছ্বাসে নৃত্যরতদের আর দমিত করা চলে না। শেষ পর্যন্ত সেই উচ্ছ্বাসেরই জয় হয়, আনন্দ নৃত্যরত সংস্কৃতির মহা মিছিল যখন শেষের পর্যায়ে তখনো দেখা যায় বাঙালি অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে প্রায় পাঁচ শ যুবক-যুবতী বাংলা গানের তালে তালে নাচছে।

বাঙালি জাতি সত্তার অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ধারণাকে বার্লিনের এই সংস্কৃতির মহাযাত্রার তুলে ধরতে বার্লিনের ‘বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ফোরাম’ সেই ২০০২ সাল থেকেই বার্লিনের বিশ্ব সংস্কৃতির মহাযাত্রার সঙ্গী হয়েছেন। তারা জানিয়েছেন ভবিষ্যতেও বার্লিনের রাস্তায় বাংলাদেশের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য আরও উজ্জ্বল হবে, আর বার্লিনের পথে গ্রন্থিত হবে নানা জাত আর সংস্কৃতির মিলন মেলায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: