d5948b7d8d3c0ed692ab36280b80e9fc-1

আহা! ছুটি

বিডিকষ্ট ডেস্ক

ঈদ মানে উৎসব। ঈদ মানে ছুটি। ঈদ মানে পরিবারের সবাই মিলে কয়েকটা দিন আনন্দ করা। একসঙ্গে হওয়া। বহুদিন পর পরিজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ঈদের এই কটা দিন কেটে যায় আনন্দ-হুল্লোড়ে, সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতে, মেলামেশায়। ঈদের এই সময়টা রাজধানী প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। কারণ, বেশির ভাগ মানুষই ঘরমুখী হয় এ সময়—বাবা মা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে উৎসব করবে বলে। কেউ কেউ আবার এই ছুটিতে দল বেঁধে কোথাও ঘুরতেও যাবেন, দেশের ভেতর বা বাইরে, কেননা একসঙ্গে সবার ছুটিছাটার সুযোগ ঈদ ছাড়া বছরে খুব কমই মেলে।
তারপরও কেউ কেউ তো রয়েই যাবেন। নানা কারণে হয়তো বাড়িতে বা অন্য কোথাও যাওয়া হবে না অনেক পরিবারের। কারও হয়তো তেমন কেউ আর নেইও গ্রামের বাড়িতে। কারও সন্তানেরা হয়তো বিদেশে, আসতে পারবে না, তাই ঈদ কাটাতে হবে একাই। তাই বলে কি ঈদের আনন্দ মাটি হবে?
জম্পেশ খাওয়াদাওয়া তো হবেইছেলেমেয়ে নিয়ে ঢাকার বাসাবোয় থাকেন মারুফ-রিনা দম্পতি। আগে ঘটা করে ঈদে গ্রামের বাড়ি, মাদারীপুর যাওয়া হতো। কেননা বাড়িতে মারুফের মা থাকতেন পথ চেয়ে। তিন বছর হলো মা নেই। বাড়ির টান মিটেছে। পথের হাঙ্গামা পেরিয়ে বাড়ি যেতে আর ইচ্ছে করে না। আবার ঢাকা শহরে যে অনেক আত্মীয়স্বজন আছেন, তা-ও নয়। তাহলে ঈদটা কীভাবে কাটে তাঁদের? বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরিরত মারুফ বলেন, এই সময় লম্বা একটা ছুটি মেলে। তাই পরিবারের সবাই মিলে আনন্দ করার উপলক্ষÿবের করি। হয় সবাই মিলে টেলিভিশনে ঈদের অনুষ্ঠান দেখি বা সিনেমা হলে গিয়ে ভালো কোনো সিনেমা দেখি। কখনোবা ছেলেমেয়ে নিয়ে এমনিতেই এদিক-ওদিক ঘুরতে যাই। যেমন গত বছর ঈদের পরদিন গেলাম বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে। তারপর বাইরে রেস্তোরাঁয় রাতে খেয়ে তবে ফিরলাম। বছরের অন্য সময় এমনভাবে সময় কাটানোরও তো ফুরসত মেলে না।
ঈদের সময়টা রাশিদা বেগমদের বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের বেশির ভাগ ফ্ল্যাটই খালি হয়ে যায়। রয়ে যায় কেবল গোটা দশেক পরিবার। ঈদের দিনে তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ, যাওয়া-আসা ঘটে। ৬৫ বছর বয়স্কা রাশিদা বেগম হেসে বলেন, এমনিতে লিফটে বা পার্কিং ছাড়া যাদের সঙ্গে সারা বছর দেখা হয় না, তারাই এ দিনে সেজেগুজে বেড়াতে আসে। সন্তানেরা বিদেশে থাকায় রাশিদা বেগম একাই থাকেন ফ্ল্যাটে, তাই তাঁর সঙ্গে সবাই দেখা করতে আসে। তিনিও উৎসাহ নিয়ে সবাইকে আপ্যায়ন করেন। নানা কিছু রান্না করেন। এমনকি ঈদের দিন বা পরদিন এমন অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, যাঁদের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বহু বছর ধরে। যেমন পুরোনো কাজের লোক বা দারোয়ান, দুধওয়ালা, স্বামীর অফিসের সেই কবেকার কর্মচারী, বহুদিনের পরিচিত কাঠমিস্ত্রি—কেউ কেউ হয়তো ঈদের বকশিশ নিতেই আসে; তবু রাশিদা খুশি হন। ভাংতি টাকা বকশিশ নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন, ওদের জন্য সেমাই রাঁধেন।
সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার এই তো সুযোগধানমন্ডিতে নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রবিউল আলম ও তাঁর স্ত্রী বীথিকা। একমাত্র ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করে। প্রতিবছর ঈদে তো আর আসতে পারেন না। ছুটিছাটা, টাকাপয়সারও ব্যাপার আছে। ঈদের দিন ছেলের সঙ্গে হয়তো দেখা হয় স্কাইপিতে বা ফেসবুকে। তাই বলে তাঁদের ঈদ একেবারে একলা কাটে না। বেশির ভাগ ঈদেই রবিউল তাঁর পুরোনো বন্ধুবান্ধব বা কলিগদের বাড়ি বেড়াতে যান। অবসরের পর একে অপরকে দেখলে খুশি লাগে। কখনো ঢাকায় বসবাসরত ভাগনে, ভাগনি বা ভাতিজি, ভাতিজারা বেড়াতে আসে। সবচেয়ে মজার হলো, প্রতি ঈদের পরদিন বিকেলে তাঁদের ফ্ল্যাট বাড়ির কমন স্পেসে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির পক্ষ থেকে একটা ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নানা রকম খাবার রান্না করে সবাই আসে, কথাবার্তা হয়, ছোটরা মজা করে। একেবারে প্রথম থেকেই এই চল আছে এই ভবনে। শহুরে পরিবারগুলো এই সুযোগে একটা চমৎকার সময় কাটায়।
শহুরে পরিবারগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। একই পরিবারের ভাইবোনেরা ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। চাইলেই উৎসবে আপনজনেরা চট করে একত্র হতে পারে না। অনেক পরিবারকে একা একাই ঈদ করতে হয়। কিন্তু নিজেকে একা ভাবলেই একা। চারপাশে প্রতিদিন যাদের সঙ্গে চলাফেরা, পথচলা—সবাইকে আপন করে নিতে জানলে একা লাগবে না। পাশের বাড়ির পরিবারটির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় আনন্দ, যে হকার প্রতিদিন পত্রিকা দেয়, তাকে না হয় আজ ডেকে এক বাটি সেমাই খাওয়ালেন। সেই কবেকার কোনো বন্ধু বা সহকর্মীকে একটা ফোন করতে পারেন, চাই কি ফ্রি থাকলে একটু বেড়িয়ে আসতে পারেন তেমন কারও বাসা থেকে। শহরে বেড়ানোর জায়গারও একেবারে অভাব নেই। ঈদের ছুটিতেও খোলা থাকে নানা বিনোদন কেন্দ্র, পার্ক, রেস্তোরাঁ। একটু সময় কাটিয়ে আসতে পারেন সেসবেও। ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পাওয়া নানা সিনেমা, ঈদসংখ্যা, পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের সদ্ব্যবহার করা যায়। আপনার বাড়ির বা ভবনের দারোয়ান, লিফটম্যান, সুইপার—এদের না হয় এদিন ডেকে ভালোমন্দ খাওয়ালেন। দেখবেন বেশ চমৎকার কেটে গেল উৎসবের দিনটি। হ্যাঁ, উৎসবের মতো করেই কাটাবেন। কত সাধারণ বিষয় নিয়েও তো উৎসব করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: