a24c44c571257b0d6e4d918280030ed0-28.-06.-16

কুমিল্লার ‘বাটিকপাড়ায়’ ঈদের মহাব্যস্ততা

বিডিকষ্ট ডেস্ক

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘরে ঘরে কাজ শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ কাপড়ে রংতুলির আঁচড় দিচ্ছেন, কেউ কেউ ‘ব্লক’ করছেন, কেউ আবার ‘এমব্রয়ডারির’ কাজে ভীষণ মনোযোগী। এই চিত্র কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামের। গ্রামটি এখন ‘বাটিকপাড়া’ নামেই বেশি পরিচিত। গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার ব্লক-বাটিকের কারখানা করে ভাগ্য বদলেছে। ওই সব পরিবারের কারখানায় নরসিংদী থেকে কাপড় কিনে এনে প্রথমে সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করা হয়। এরপর তাতে ব্লক ও বাটিকের নকশা করে বাজারে বিক্রি করা হয়।

এসব ব্যবসা মূলত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশে কমলপুর গ্রাম থেকেই প্রথম ব্লক ও বাটিকের পোশাক তৈরি শুরু হয়েছে। এখন পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ আনন্দপুর এবং গলিয়ারা গ্রামের অনেক পরিবার এ কাজ করছে। কমলপুর থেকে কাজ শিখে অনেকে নরসিংদীতে ব্লক-বাটিকের ব্যবসা খুলেছেন।

ঈদ উপলক্ষে ওই গ্রামে এখন ব্যাপক ব্যস্ততা। রাতদিন পোশাকে বাটিকের কাজ চলছে। কারিগর, শ্রমিক ও মালিকের দম ফেলার সময় নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার শাড়ি, থ্রি-পিস, লুঙ্গি ও বিছানার চাদর তৈরি হচ্ছে। সেই পোশাক ও কাপড় চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাটিকের কাজ করে ভাগ্য বদলেছে বহু মানুষের। চাঞ্চল্য এনেছে গ্রামটির অর্থনীতিতে। শুধু পোশাক তৈরি নয়, এর পরিবহন ও অন্যান্য কাজেও কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের।

কমলপুরের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রামটিতে প্রথম এ ব্যবসা শুরু করেছিলেন লাল মিয়া নামের এক ব্যক্তি। তিনি ১৯৭৫ সালে ভারতের কলকাতা ও ত্রিপুরা রাজ্যে কাপড়ে মোম ও রং দিয়ে ব্লক তৈরির কাজ শেখেন। এরপর নিজ গ্রামে ফিরে শুরু করেন এ কাজ। এর আগে অবশ্য ওই গ্রামে খাদি কাপড় থেকে বিভিন্ন পোশাক তৈরি হতো।

লাল মিয়া এখন জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জ এলাকার হিল টাউন মার্কেটে কুমিল্লা বাটিক ঘরের মালিক তিনি। বাটিকের কাজ করে তিনি প্রায় দুই হাজার শতক জমি কিনেছেন। গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন অট্টালিকা। একসময় তাঁর কারখানায় কাজ করা বহু কারিগর এখন নিজেরাই এ ব্যবসা করছেন। কমলপুরের আহাম্মদীয়া হ্যান্ডি ডাইংয়ের মালিক আমানউল্লাহ জানান, ব্লক, এমবোস ও নানা ধরনের নকশা তৈরির কাজ তাঁরা নিজেরাই করেন। তাঁর কারখানায় ৩০ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিক আছেন।

কমলপুর গ্রামের ইব্রাহীম খলিল লুঙ্গি প্রিন্ট করেন। ওই লুঙ্গি তিনি আমানত শাহ লুঙ্গির কাছে বিক্রি করেন। সরেজমিনে দেখা যায়, ইব্রাহীমের বাড়ির উঠান ও সামনের সড়কে রং করা লুঙ্গি শুকানো হচ্ছে। ঘরের ভেতরে নারীরা লুঙ্গি ভাঁজ করছেন। ঈদ উপলক্ষে বাড়তি কার্যাদেশ আছে বলে জানান ইব্রাহীম।

এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, পুঁজির সংকটই এ ব্যবসার বড় সমস্যা। পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচও বেড়ে গেছে। তাঁরা আরও জানান, কয়েক মাস আগে এক কেজি রঙের দাম ৫৫০ টাকা ছিল। এখন তা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় উঠেছে। একসময় ওই গ্রামে মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যেত। এখন কয়েক গুণ বেশি দিতে হচ্ছে। কুমিল্লা খাদি ঘরের স্বত্বাধিকারী প্রদীপ কুমার রাহা বলেন, পৃষ্ঠপোষকতা ও বড় ধরনের পুঁজি পেলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা আরও বেশি পোশাক তৈরি করতে পারবে। দিনে দিনে এ পোশাকের কদর বেড়েছে।

জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ মনে করেন, ব্লক-বাটিকের কাজ করা শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণ দরকার। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তাঁরা নতুন কিছু করতে পারবেন বলে অভিমত মামুনুর রশীদের। বাটিক শিল্প কুমিল্লা অঞ্চলের ঐতিহ্য বলে অভিহিত করে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল বলেন, একে ধরে রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: