kodom-400x200

বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ কারে দান, বর্ষায় বাংলাদেশ

বিডিকষ্ট ডেস্ক

এসো হে সজল ঘন বাদল বরিষণে
বিপুল তব শ্যামল স্নেহে এসো হে এ জীবনে ॥
এসো হে গিরি শিখর চুমি ছায়ায় ঘেরা কানন ভূমি,
জীবন ছেয়ে এসো হে তুমি গভীর গরজনে ॥
অবিরাম বৃষ্টি মাঝে বর্ষার মন মোহিনী রূপটি বাংলার প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের মেলা বসায়। বর্ষার রূপ-বৈচিত্র্য দোলা দেয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এই বর্ষার কবিতায়।

1464250917-rain-dhaka-umbralla

এসেছে বর্ষাকাল। বর্ষা আসে নূপুর পায়ে ঝমঝমিয়ে। বর্ষার গুণগান গেয়ে কবিরা লেখেন কবিতা। ভাবুক মন হয় উতলা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান/মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে, এই যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান/আজ এনে দিলে হয়তো দেবে না কাল, রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল/এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতি স্রোতের প্লাবনে, ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরনী বহি তব সম্মান।’ রবিঠাকুর বর্ষার রূপ-গন্ধের সাথে নিজেকে একাকার রেখেছেন। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গান। রবীন্দ্রনাথের উপস্থাপিত বর্ষা আজো আমাদের মধ্যে অনুরণন সৃষ্টি করে।
বর্ষাই তো বাংলার চিরায়ত রূপ। কখনো রিমঝিম গান গেয়ে বৃষ্টি নামের মিষ্টি মেয়েটি সুরে সুরে ভরিয়ে তোলে প্রকৃতি। আবার ঝুম ঝুম নূপুর বাজিয়ে মুগ্ধ করে দেয় আমাদের মন। বর্ষায় খাল-বিল- পুকুর-নদী-ডোবা পানিতে থই থই করে। সবুজ সজীবতায় গাছপালা, বন-বনানী প্রাণ ফিরে পায়। আর কত রকম ফুল ফোটে এই বর্ষায়। খালে বিলে বাংলার জাতীয় ফুল শাপলার অপরূপ দৃশ্য তো আছেই। শাপলা পদ্ম ও রূপ ছড়াতে কম যায় না। কেয়া কামিনী হিজল বকুল জারুল করবীÑ সোনালু এসবও বর্ষাঋতুতে ফুটে থাকতে দেখা যায়। আর জুঁই-চামেলিকে বাদ দেবো কী করে। তবে বর্ষার প্রধান ফুল হলো কদম। বৃষ্টিভেজা কদমের মনকাড়া সৌরভ ভিজে বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়ে সারা প্রকৃতিতে। অবশ্য এ দৃশ্য গ্রামবাংলাতেই বেশি চোখে পড়ে।

95aad87b6d25115e4379aa44319b74cb-4
বর্ষা মওসুমে যখন চার দিক ভিজে ওঠে তখন আমাদের মনও হয় সিক্ত। মৌন নীলের ইশারায় আমাদেরও প্রাণে জেগে ওঠে অজানা কামনা। আমরা হয়ে উঠি মনে-মননে বর্ষামুখর। এ ঋতুর বিচিত্র রূপ শহর ও গ্রামে ভিন্ন ধরনের। সাধারণত গ্রামে বর্ষার শোভা অতুলনীয়। কারণ এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ মাঠ ঘাট প্রান্তর এক সবুজ শ্যামল গাছপালা ও ঝোপঝাড়। যেন ফিরে পায় তরতাজা নতুন জীবন। বর্ষাকে ঘিরে নানা ধরনের খেলাধুলা দেখা যায় গ্রামে। যেমন কাবাডি খেলার মূল সময় কিন্তু বর্ষাকালেই। বর্ষার সময়টাতে মাটি থাকে ভেজা কর্দমাক্ত। আজ হয়তো কৃত্রিম উপায়ে অ্যাস্টোটার্ব মাঠে কাবাডি খেলা হয়। কিন্তু যুগ যুগ ধরে আমাদের গ্রামগঞ্জে বর্ষা মওসুম শুরু হতেই তরুণ যুবক, বৃদ্ধরাও লুঙ্গি কাছা দিয়ে নেমে গেছে কাবাডি খেলায়। বর্ষাকে ঘিরে আবার বেশ কিছু পেশা সজীব হয়ে উঠে। যে সব নিচু ভূমিতে শুকনো মওসুমে পানি থাকে না সেসব ভূমি বর্ষা এলেই পানিতে ভরে ওঠে। এটাই আমাদের প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য। পায়ে হাঁটা পথগুলো সব বর্ষার পানিতে ডুবে যায়। ফলে এসব ভূমি দিয়ে এক গ্রামের সাথে আরেক গ্রামের সাথে, নিকটতম হাটে বাজারের যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় পানি বাহন নৌকা। তাই মওসুমি মাঝিদের দেখা পাওয়া যায়। যারা অন্য মওসুমে হয়তো কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

51e12cfa059b9-1
বর্ষার মনোহর সৌন্দর্য দর্শন থেকে শহুরে মানুষেরা অনেকখানি বঞ্চিত। ইট কাঠ পাথুরে জীবনে বর্ষার আগমন তাদের কাছে তেমন আনন্দের নয়, বরং বর্ষা তাদের কাছে এক ধরনের উৎপাত ও বিরক্তিকর। তবে যারা ভাবুক মনের বর্ষার সৌন্দর্য তাদের কাছে অপূর্বভাবেই ধরা দেয়। তাই কবির লেখনীর স্পর্শে বর্ষা পায় নতুন রূপ। বর্ষা দরিদ্রের দুয়ারে নিয়ে আসে হতাশা। তাদের ক্ষুদ্র গৃহস্থালি বর্ষার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তারা ব্যস্ত হয়ে ওঠে। মাথা গোছার ঠাঁই নেই যাদের, তাদের কষ্টটাই বেশি। পলিথিন মোড়া সংসার নিয়ে তারা যাযাবরের মতো কেবলই আশ্রয় খুঁজে ফিরে।
বর্ষাকাল মানেই আকাশ কালো করা ঘন মেঘের আনাগোনা, যখন তখন ঝমঝমিয়ে পড়ে বৃষ্টি। পথে ঘাটে কাদাপানি। ঘরে স্যাঁতসেঁতে ভাব। তাই তো কবি শামসুর রাহমান বর্ষার বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন- ‘হঠাৎ আকাশ সাদা মুখটি কালো করে, কালো মেঘে বুকটি ফুঁড়ে পানি পড়ে/ ঝর ঝর ঝর একটানা বৃষ্টি ঝরে, বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি ঝরে।’ বর্ষার বৃষ্টি তো অন্যতম। বর্ষার আকাশে রহস্যঘেরা অন্ধকারে নিবিড় হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে। কখনো সমস্ত আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে গেলেও বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় না। আবার কখনো বিনা মেঘেই শুরু হয়ে যায় তুমুল বৃষ্টি। নাগরিক যান্ত্রিক জীবনে বৃষ্টিকে প্রায়ই বেমানান। কিছুটা বিরক্তিকরও মনে হতে পারে। অরণ্য প্রকৃতির মাঝেই বৃষ্টি যেন বেশি মানানসই। তাই তো কবিগুরু রবিঠাকুর তার নৌকাডুবি উপন্যাসে বলেছেন, ‘বর্ষা ঋতুটা মোটেই উপরে শহুরে মনুষ্য সমাজের পক্ষে তেমন সুখকর না, ওটা অরণ্য প্রকৃতির বিশেষ উপযোগী।’ – শহুরে জীবন যাপনে বেশির ভাগের কাছে বৃষ্টিটা বিড়ম্বনারই নামান্তর। আবার কখনো কখনো কাঠফাটা রোদ্দুরে ভ্যাপসা গরমে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, এ বৃষ্টিটাই তখন সবার কাছে হয়ে ওঠে চরম আরাধ্য, পরম পাওয়া। এ বৃষ্টিতে তপ্ত ধরণী মুহূর্তেই হয়ে ওঠে শীতল সজীব। সহসাই মন নেচে ওঠে ময়ূরের মতো করে। উচাটন মন তখন কিছুতেই ঘরে থাকতে চায় না।

Women-Rain-coxsbazartimes.com-

 

প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মনের অজান্তেই গেয়ে ওঠে কেউ- ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাতো মন/ কাছে যাবো, কবে পাবো/ ওগো তোমার নিমন্ত্রণ।’ বৃষ্টির দিনে কাক্সিক্ষত সেই প্রিয়জনকে কাছে পেলে বলে দেয়া যায় হৃদয়ের কোণে জমিয়ে রাখা সব কথা। বৃষ্টি হলে সোহাগিনী বর্ষাকে আমরা ছন্নছাড়া বৃষ্টিবনে রাগ করি। ঠিক ওই পর্যন্তই। কিন্তু আজ নগরায়নের ফলে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার পরিণতিতে বর্ষা দেখা দিচ্ছে নতুন রূপে, নতুন চরিত্রে। তার ওপর আছে নগরজীবনে অপরিকল্পিত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা। এ দেশের মানুষের জীবনাচারের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে অনেক। যে লোকটি এখন গ্রামে থাকেন তিনি আর তার গ্রামের ওপরই নির্ভরশীল নন। নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন নগরজীবনের ওপর। বেশির ভাগ মানুষের প্রিয় ফলটি পর্যন্ত এখন শহর থেকে কিনে নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়। তাই নগরজীবনের দুঃসহ জলাবদ্ধতা দেশবাসীকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া নদীর নাব্যতা হারানোর ফলে অল্প বৃষ্টিতেই বন্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশকে। বর্ষার সুবিধা অসুবিধা থাকলেও বর্ষা অনেকেরই প্রিয় ঋতু। ধূলিমলিন প্রকৃতির চার দিক ধুয়েমুছে সাফ করে দেয় বর্ষার পানি। ঝলমল করে ওঠে চার দিক। বর্ষার প্রত্যাশায় সবাই থাকে উন্মুখ।

Please Visit  :  http://www.bdcost.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: