150785_194

কতটা নিরাপদ আমাদের সন্তানেরা

BDcost Desk: 

বাড়ির মেয়েটি স্কুল যায়। কখনো একা, কখনোবা দলবেঁধে। পুরো সময় মায়ের মন উচাটন। সংসারের চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা মায়ের মন ভালো লাগে না কিছুতেই। ঠিকমতো ফিরবে তো মেয়ে আমার? ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরলে তবেই শান্তি। বর্তমানে এরকম ঘরে থাকা মায়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক কমে গেছে শুধু এরকম টেনশন আর অনিশ্চয়তার চাপ না নিতে পেরে। এখন মায়েরা মেয়েদের স্কুল, কলেজ ও কোচিং পর্যন্ত দৌড়ান মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কেন এমন অবস্থা?
আধুনিক যুগ। আধুনিক পদ্ধতি। আধুনিক মানুষের সংখ্যাই এখন বেশি। তবুও বাবা-মায়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন আগের চেয়ে বেশি। সম্প্রতি উইলস লিটল ফাওয়ার স্কুলের ছাত্রী রিশার মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়, বিবেক। কাঁপিয়ে দিয়েছে বাবা-মায়ের অন্তর। মাস ছয়েক আগে মায়ের সাথেই ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্সে জামা বানাতে গিয়েছিল রিশা। সেখানে জরুরি প্রয়োজনে রসিদে উল্লেখ নাম ও নাম্বার থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। কাটিং মাস্টার বদিউল সেখান থেকেই জানতে পারে রিশার নাম ও নাম্বার। এরপর শুরু হয় ফোনে উত্ত্যক্ত করা। বিগত ছয় মাস নানাভাবে উত্ত্যক্ত করার পর শুরু হয় সরাসরি উৎপাত। রিশার স্কুল, বাসা ও রাস্তাঘাটে বখাটেপনা করে।
রিশার মন গলাতে না পেরে তাকে কাবু করতে শেষ পর্যন্ত ছুরিকাঘাত করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায় রিশা। কাঁদিয়ে যায় পরিবারসহ হাজারো ছাত্রছাত্রীকে। জানা যায় বখাটে বদিউলকে বারবার সাবধান করা হয়েছে। ভালোমতো বোঝানোও হয়েছে। কোনো কিছুতেই বখাটের বখাটেপনা থামেনি। রিশার কাছের জনদের কাছ থেকে জানা যায়, রিশা ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত ভদ্র ও মিষ্টভাষী ছিল। বখাটে অশ্লীলভাবেও তাকে উক্তত্য করত। তবে রিশার দৃঢ়তায় বখাটে কোনো সুবিধা করতে পারেনি। তাই প্রতিশোধ নিতেই এমন জঘন্য কাজটি করেছে।
এ তো গেল রিশার কথা। কয়েক মাস আগে কুমিল্লা সেনানিবাসের মতো নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় আরেকটি নিষ্পাপ প্রাণ তনু। কলেজছাত্রী। সাংস্কৃতিকমনা। ব্যক্তি হিসেবে তনুর সম্পর্কেও জানা যায় অত্যন্ত ভদ্র নম্র একটি মেয়ে। কোনো দিনই তার সম্পর্কে খারাপ কথা শোনা যায়নি। যেমনটি রিশার ক্ষেত্রেও। তার পরও এরাই বখাটেপনার নির্মম শিকার হলো। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ভদ্র নম্র নরম মনের মেয়েগুলোকেই টার্গেট করছে বখাটেরা?
ইভটিজিংকেন্দ্রিক যেকোনো ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের মনে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করে। তা যদি হয় এমন মর্মান্তিক তাহলে তা শুধু আতঙ্কই নয়, ভীতির সঞ্চার করে। তনু হত্যাকাণ্ডের পর যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল তার রেশ কাটতে না কাটতেই দিনের বেলায় প্রকাশ্যে উইলস লিটল ফাওয়ার স্কুলের মতো জনবহুল স্থানে রিশার হত্যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। স্কুলের সামনেও যদি বখাটে থেকে রেহাই পাওয়া না যায়, তাহলে কোথায় নিরাপদ আমার মেয়েরা? এ প্রশ্ন সব মায়ের। তনু রিশা এরপর কে? এ প্রশ্ন সব ছাত্রীর। বিক্ষোভে এরকমই লেখা ব্যানার ফেস্টুন বহন করছে ছাত্রছাত্রীরা।
মিসেস সালমা হক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। স্বামী ব্যাংকার। মেয়েকে স্কুলে ঢুকিয়ে অভিভাবক ছাউনিতে বসেছিলেন। কাছে যেতেই বোঝা গেল এ সম্পর্কেই আলোচনা চলছে। বললেন, রিশার ওপর আক্রমণ আমাদের বিশ্বাসের আস্থার জায়গা নাড়িয়ে দিয়েছে। এতদিন শুনতাম স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার পথেই বখাটেরা বিরক্ত করে। তাই সবসময় মেয়েকে বলতাম দলবেঁধে বাড়ি ফিরতে। একা যেন কখনোই না আসে। রিশার ঘটনার পর তো সে ভরসাও পাচ্ছি না।
এরকমই আরেকজন মিসেস কাশেম। বাড়িতে বৃদ্ধা শাশুড়ি ও ছোট শিশু রয়েছে। তাই প্রতিদিনই মেয়েকে আনানেয়া করতে পারেন না; কিন্তু রিশার ঘটনার পর বাধ্য হয়েই দুধের শিশু কোলে করে মেয়েকে স্কুলে দিতে এসেছেন। আবার ছুটির সময় নিতে আসবেন। এতে কষ্ট ঝামেলা দুটোই হলেও কিছু করার নেই। মেয়েকে একা পাঠিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন না।
শুধু এই একটি স্কুলই নয়, এরকম চিত্র এখন প্রায় প্রতিটি স্কুলের সামনেই দেখা যাচ্ছে। ইভটিজিং নিয়ে অনেক কঠোর আইন হলেও এখন পর্যন্ত তা থামছে না। নিয়মিত বিরতিতে কেউ না কেউ এর শিকার হয়েই চলেছে। ঘটনার পর তুমুল উত্তেজনা থাকলেও কিছু দিন পর মানুষ ভুলে যায়। সে মামলার আপডেট বা সমাপ্তির খবর কারো জানা হয় না। বিগত বছরগুলোর ইভটিজিং কেসগুলো স্টাডি করে দেখা যায়, বেশির ভাগই স্কুলপড়–য়া ছোট ছোট মেয়েরাই এর শিকার। বখাটেদের বিকৃত লালসার শিকারও স্কুল পড়–য়ারাই।
এ সম্পর্কে কথা হয় সাইকোলজিস্ট সুমাইয়া আক্তারের সাথে। গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তার মতে, রাস্তাঘাটে যারা বখাটেপনা করে তাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন নেশায় আসক্ত। বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতাও দেখা যায় তাদের মধ্যে। তারা সমাজছাড়া হয়ে থাকে। সব কিছু মিলে এক ধরনের মানসিক বৈকল্য সৃষ্টি হয় বখাটেদের। আর স্কুলপড়–য়া কিশোরীরা অনেকটাই লাজুক ও নরম হয়ে থাকে। নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রবণতা থেকেই বা অধিক শাসনের ভয়ে অনেক সময় বাড়িতে চেপে যায় সমস্যাগুলো। আবার নিজে নিজে প্রতিরোধ ক্ষমতাও হয় না। আর তাই প্রতিরোধ না পেয়ে বখাটের সাহস বেড়ে যায়। সে কারণেই ছোট কিশোরীরা তাদের প্রধান টার্গেট হয়।
বেশির ভাগ স্কুলপড়–য়া হলেও সব বয়সী নারীই বখাটেপনার শিকার কমবেশি হচ্ছে। অনেক সময় পর্যাপ্ত সাবধানতা বা ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও লাভ হয় না। প্রতিরোধ হলে হিতে বিপরীত হওয়ার নজিরও কম নেই। এসিড সন্ত্রাস, সাইবার সন্ত্রাস দিন দিন সবার গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে বিশাল আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। হচ্ছে। তবে স্কুল কম্পাউন্ডের সামনেই এমন ঘটনা এই প্রথম। তাই এ নিয়ে ভাবনাটা নতুন। তবে গার্লস স্কুলের সামনে বখাটেদের জটলা, বিরক্ত করা কিন্তু নতুন নয়। অনেক স্কুলের সামনে বা পাশেই ছেলেদের জটলা চোখে পড়ে। এভাবে চলতে চলতেই আজ বখাটেদের সাহস বেড়ে আঘাত করা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে?
এ নিয়ে কী ভাবছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষকেরা। জানতে চেয়েছিলাম প্রধান শিক্ষিকা মিসেস সাঈদা নার্গিসের কাছে। ব্রাঞ্চ-১, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়। বললেন, রিশার ঘটনা মর্মান্তিক। আর স্কুলের সামনে ঘটা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবশ্যই আমরা সবাই চাই অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। এমন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সবার মনে থাকে। তিনি আরো বলেন, আমরা খুবই সচেতন ছাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়ে। স্কুলের অভ্যন্তরেই শুধু চেকিং নয় বরং আমরা ইভটিজিং বিষয়েও সচেতন। তাই পুরো স্কুল, স্কুলের বাইরে বেশ কিছু দূর পর্যন্ত জায়গা সিসি টিভির আওতায় আছে।
দোষীর শাস্তি দাবিই বর্তমানের প্রধান এবং একমাত্র দাবি। শুধু উইলস লিটল ফাওয়ারের ছাত্ররাই নয়, তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে প্রায় সব স্কুলছাত্রীই। এরা আমাদেরই সন্তান। বড় আদরের সন্তান। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদেরই দায়িত্ব। ইভটিজিং কেসগুলোর বেশির ভাগেরই কোনো সুরাহা না হওয়ায় বখাটেরা সুযোগ পেয়ে যায়।

কেনার আগে অসংখ্য শপ থেকে মুহূর্তেই সর্বনিন্ম বাজার মূল্য যাচাই করতে ক্লিক করুনঃ BDcost

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: